সুপারস্টারনিউজ লাইফস্টাইল ডেস্ক : ভগবান অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছিলেন নৈষ্কর্ম্য অবলম্বন না করে কর্মফলের প্রতি নিরাসক্ত থেকে তাঁর কর্তব্যকর্ম পালন করার জন্য
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার (২/৪৭) শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।/ মা কর্মফলহেতুর্ভূমা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি।।’ অর্থাৎ স্বধর্মবিহিত কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কোন কর্মফলে তোমার অধিকার নেই। কখনও নিজেকে কর্মফলের হেতু বলে মনে করো না এবং কখনও স্বধর্ম আচরণ না করার প্রতিও আসক্ত হয়ো না।
বলার অপেক্ষা রাখে না ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’র এটি একটি অন্যতম শ্লোক। এখানে তিনটি বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এক. শাস্ত্রনির্ধারিত কর্তব্যকর্ম, দুই. বিকর্ম বা খেয়ালখুশিমতো কর্ম এবং তিন. নৈষ্কর্ম্য। কর্তব্যকর্ম হচ্ছে প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা বদ্ধ অবস্থায় জাগতিক কর্ম। প্রকৃতির তিনটি গুণ হলো সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ। বিকর্ম হচ্ছে শাস্ত্র অথবা গুরুদেবের অনুমোদন ব্যতীত কর্ম এবং কর্তব্যকর্ম এড়িয়ে যাওয়া বা না-করাকে বলা হয় নৈষ্কর্ম্য।
ভগবান অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছিলেন নৈষ্কর্ম্য অবলম্বন না করে কর্মফলের প্রতি নিরাসক্ত থেকে তাঁর কর্তব্যকর্ম পালন করার জন্য। মানুষ যখন কর্মফলের প্রত্যাশা করে, তখন সে কার্য-কারণে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এভাবেই সে কর্মের ফলস্বরূপ সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করে।
কর্তব্যকর্মকে আবার তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা বিধিবদ্ধ কর্ম, সঙ্কটকালীন কর্ম ও আকাঙ্ক্ষিত কর্ম। কোনো রকম ফলের প্রত্যাশা না করে শাস্ত্রের অনুশাসন অনুসারে বিধিবদ্ধ কর্তব্যকর্ম হচ্ছে সত্ত্বগুণের কর্ম। ফলের প্রত্যাশা করে যে কর্ম করা হয়, তা বন্ধনের কারণ হয়; আর তাই তা অশুভ। কর্তব্যকর্ম সকলকেই করতে হয়, কিন্তু কোনো রকম ফলের প্রত্যাশা না করে নিরাসক্তভাবে সেই কর্ম করতে হয়; এই প্রকার ফলের আশাহীন কর্তব্যকর্ম নিঃসন্দেহে মুক্তির পথে চালিত করে।
ভগবান তাই অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ফলাফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে কেবল কর্তব্য পালনের উদ্দেশ্যেই কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে। তাঁর যুদ্ধে যোগ না দেওয়াও ছিল অন্য এক প্রকারের আসক্তি। এই প্রকার আসক্তি কাউকে মুক্তির পথে চালিত করে না। ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক, যে কোন প্রকার আসক্তিই বন্ধনের কারণ। কর্তব্যকর্ম থেকে নিষ্কর্মার মতো বিরত থাকা পাপ, তাই কর্তব্যবোধে যুদ্ধ করাই ছিল অর্জুনের পক্ষে মুক্তির একমাত্র মঙ্গলময় পথ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যোগে যুক্ত হয়ে কর্ম করার নির্দেশ দিচ্ছেন। বলছেন ‘হে অর্জুন, ফলভোগের কামনা পরিত্যাগপূর্বক ভক্তিযোগে স্থিত হয়ে স্বধর্মবিহিত কর্ম আচরণ কর। কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সম্বন্ধে যে সমবুদ্ধি, তাকেই যোগ বলা হয়।’
এখন প্রশ্ন হলো, যোগ বলতে কি বোঝায়? যোগের অর্থ সর্বদা চিত্তচাঞ্চল্যকারী ইন্দ্রিয়সমূহ সংযম করে একাগ্রচিত্তে পরমেশ্বরের ধ্যান করা। পরমেশ্বর কে? পরমেশ্বর স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২ শ’ ১৩ বছর আগে বাসুদেব ও দেবকীর ঘরে শ্রীকৃষ্ণ অবতাররূপে ভূমিষ্ট হন। দাপর যুগে সে সময় রাজা কংসের অত্যাচারে চারিদিকে অরাজকতা, নৃসংশতা, নিপীড়নে মানুষ জর্জরিত ছিল। শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুসারে তাঁকে স্বয়ং ভগবান এবং বিষ্ণুর পূর্ণাবতার মনে করা হয়। তিনি সে সময় দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনে এই মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হন।
যেহেতু পরমেশ্বর স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে আদেশ করছেন, সুতরাং সেই যুদ্ধের ফল নিয়েও অর্জুনের চিন্তা করার কিছু নেই। লাভ অথবা জয় হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাধীন। অর্জুনের কর্তব্য কেবল শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসারে যুদ্ধ করা। এ সংসারে প্রতিটি মানুষেরই পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের এই নির্দেশ স্মরণে রাখা উচিত। শ্রীকৃষ্ণের আদেশ পালন করাই প্রকৃত যোগ। ভগবানের অধীন, দাসত্ব স্বীকার করতে হবে। সেটিই কৃষ্ণভাবনায় কর্তব্য পালনের যথার্থ পন্থা।
অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয় এবং তাই তিনি বর্ণাশ্রম ধর্মের আচরণ করছিলেন। বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে, বর্ণাশ্রম ধর্মের একমাত্র উদ্দেশ্য শ্রীবিষ্ণুকে তুষ্ট করা। জড় জগতের নিয়ম অনুসারে নিজের সন্তুষ্টিবিধানের জন্য চেষ্টা না করা, ইন্দ্রিয়-সুখ বিসর্জন দেয়া।
ব্রহ্মসংহিতাতে স্বয়ং ব্রহ্মা বলছেন, শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর ভগবান। কেউই তাঁর সমকক্ষ নন বা তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ নন। তিনিই আদিপুরুষ, তিনিই সর্ব কারণের পরম কারণ। ‘ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।/ অনাদিরাদিগোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।।’ অর্থাৎ ভগবানের গুণাবলীর অধিকারী বহু পুরুষ আছেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পুরুষ; কারণ তাঁর ঊর্ধ্বে আর কেউ নেই। তিনি পরমেশ্বর এবং তাঁর শ্রীবিগ্রহ সচ্চিদানন্দময়। তিনি অনাদির আদিপুরুষ গোবিন্দ এবং তিনিই সর্ব কারণের কারণ। (ব্রহ্মসংহিতা ৫/১)
ভাগবতেও পরমেশ্বর ভগবানের অনেক অবতারের উল্লেখ আছে, কিন্তু সেখানেও শ্রীকৃষ্ণকে আদিপুরুষ ভগবানরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই পরমপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আজ শুভ জন্মতিথি। এই তিথিতে পরমপ্রভুর নির্দেশ মেনে জীবনযাপন করা উচিত।
সুপারস্টারনিউজ/এআর