বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন

রাজশাহীতে বাড়ছে বাল্যবিবাহ

প্রতিনিধির নাম : / ৩৪ Time View
প্রকাশকাল : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সুপারস্টারনিউজ প্রতিবেদক : রাজশাহীতে বেড়েই চলেছে বাল্যবিবাহ। গেল দুই বছর ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃত্বে শূন্যতা, এনজিওগুলোর বরাদ্দ কমায় ভাটা পড়েছে সচেতনতা কার্যক্রমে। সরকারি দপ্তরগুলোর নামমাত্র থাকা কমিটি থামাতে পারছে না বাল্যবিয়ের এই হার। এ কারণে সরকারি-বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে জোরদার কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান সংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, রাজশাহীতে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সের ৬৫ দশমিক ০৭ শতাংশ ছেলে-মেয়ে বসছে বিয়ের পিঁড়িতে। তাদের মধ্যে ৭ দশমিক ১২ শতাংশ ১০ থেকে ১৪ বছরের শিশু।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫- এর জরিপ বলছে, ১৮ বছরের আগেই রাজশাহী বিভাগে ৬৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। যা শহরে ৫০ শতাংশ আর গ্রামে ৫৬ শতাংশ। আর ১৫ বছরের আগে বিয়ের পিড়িতে বসছে ১৩ শতাংশ শিশু। একই সঙ্গে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনাও।

রাজশাহীর চরাঞ্চলের অবস্থা আরো ভয়াবহ। উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের অভাবে রাজশাহীর চর মাঝারদিয়ায় ৯৫ ভাগ শিশু শিকার হচ্ছে বাল্যবিয়ের। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুলেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া ‘নিরাপদ’ মনে করছেন চরের অভিভাবকরা। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে তেমন সরকারি কার্যক্রম চোখে পড়ে না পদ্মার চরে।

নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এমদাদুল হক বলেন, ‍“অভিভাবকরাই তাদের মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেন। কারণ উচ্চশিক্ষা করতে হলে এসএসসি লেভেলের স্কুল থাকার দরকার। চরে কিন্তু সেগুলো নেই।”

পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে জানিয়েছেন ব্লাস্ট রাজশাহীর সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সামিনা বেগম। অপ্রাপ্ত বয়সের বিয়েতে বিবাহবিচ্ছেদ ও সাংসারিক কলহ অত্যন্ত বেশি বলছেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, “আমার কাজের যে সময়, সেই সময়ের মধ্যে আমি রিসেন্ট (সম্প্রতি) দেখছি যে, ডিভোর্সের সংখ্যাটা অনেক বেশি তুলনামূলক। মানে ভাবিয়ে তোলার মতো একটা সংখ্যা বর্তমান সময়ে। অথচ বাল্যবিয়ে নিয়ে সচেতনতা, প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগে কাজ করছে- জেলা, উপজেলা, স্থানীয় সরকারসহ অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান। সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও।”

পবা উপজেলার বড়গাছি ইউনিয়নের সমাজসেবী রহিমা বেগম জীবন উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে। এক সময় তিনি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করেছেন উপজেলাজুড়ে। বাল্যবিয়ে নিয়ে পূর্বের মতো প্রচারণা নেই বলে জানান এই সমাজসেবী। তার সঙ্গে সুর মেলালেন অনেকে।

দুঃস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতির পরিচালক বিভাগীয় জয়িতা রহিমা বেগম বলেন, “আমরা শুধু নামই শুনেছি বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটি আছে। কমিটির কোনো সক্রিয়তা আমাদের চোখে পড়ে না। বাল্যবিয়ে রোধ করার অনেক চেষ্টা করেছি আমরা। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব থেকে চৌকিদার এবং চেয়ারম্যান-মেম্বার নিয়ে আমরা মিটিং করছি, তারপরেও এ বিষয়টি আমরা মানুষকে বুঝতে পারি না।”

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তারাও বলছেন, প্রকল্প ও বাজেট স্বল্পতায় এ নিয়ে প্রচারণায় গতি কমেছে, তবে নিজেদের সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিভিন্ন উঠান বৈঠক এবং আমরা পরিষদের আগে যেমন লোকজনকে ডাকা হতো এটির তো একটি খরচ আছে। সেগুলো তো আমাদের বাজেটে নেই। এগুলো যতটুকু আমরা নিজের অর্থায়নে পারি এতটুকু করি। তাছাড়া একটু কঠিন সমস্যার মধ্যেই আমরা আছি।”

দর্শনপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী বলেন, “বাল্যবিয়ে বন্ধে কোনো বাজেট নেই। আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করি যেন বাল্যবিয়ে এলাকায় না হয়, সেটা বন্ধ করার চেষ্টা করি। আমাদের ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশ আছে যে, যদি কোথাও বাল্যবিয়ে হয় আপনারা তড়িঘড়ি গিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করবেন।”

২০২৪ এর আগে রাজশাহী অঞ্চলে বাল্যবিয়ে নিয়ে সচেতনতা, আইনি সহায়তা ও বয়ঃসন্ধিকালিন স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছে অন্তত অর্ধশতেরও বেশি বেসরকারি সংস্থা। তবে, প্রকল্পের বাজেট স্বল্পতায় ধীরে ধীরে এ নিয়ে কাজ কমেছে তাদের।

রাজশাহী ইইউডিএস আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক তাসবীর আহমদ খাঁন বলেন, “বাল্যবিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের একটা কম্পোনেন্টের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা হতো। মূলত ওই প্রকল্পগুলা বিশেষ করে ১৯ এবং ২২ সালের পরে কিছুটা কমে গেছে, ডোনার ফান্ডিংও অংশে কমে গেছে। সেই প্রকল্পগুলা এখন আর বাস্তবায়িত না হওয়ায় আমাদের এই উঠান বৈঠকগুলা কমে যায়।”

রাজশাহী লফস প্রকল্পের ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, “ধীরে ধীরে কর্মসূচিগুলো খুব ছোট হয়ে যাচ্ছে। বড় খুব বড় প্রতিষ্ঠান যেগুলো হয়তো কিছু কিছু প্রোগ্রাম করছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একবার রুট লেভেলে যাওয়া কিন্তু কঠিন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু ছোট সংগঠনগুলোকে নিয়ে তৃণমূলে যায়। ওই ফান্ডিংগুলো কমে যাওয়ার কারণেই কিন্তু আমাদের এ ইফেক্টটা পড়ছে। বিভিন্ন কাজের মধ্যেই বাল্যবিয়ে নিয়ে ৮২টি ক্লাব-কমিটি ও ৫০টি হাবে সচেতনতা প্রোগ্রাম চালাচ্ছেন। ”

যদিও উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, নাম মাত্র ক্লাব আর ট্যাগ প্রোগ্রাম দিয়ে বাল্যবিয়ে নিরোধ সহজ হবে না। পাশাপাশি দেশের আর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও দায় দিচ্ছেন তারা।

উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পাল বলেন, “আর্থিক সংস্থান না থাকায় অনেকগুলো এনজিও বন্ধ হয়ে গেছে। যারা ছিলো তারাও সীমিত হয়ে আসছে এবং যারা সীমিত হয়ে আসছে তারা হয়তো এই ইস্যুটা বাদ দিয়ে চলে যাচ্ছে।”

পরিবর্তন উন্নয়ন বিশ্লেষক রাশেদ রিপন বলেন, “আমি মনে করি যে, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি যদি মনে করে যে আমি আমার কমিউনিটিতে কোনো বাল্যবিয়ে দেব না, এটি সম্ভব। আসলে আইন করে এটি কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা যাবে না, যদি না আমাদের সামাজিক আন্দোলন এবং মানুষের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তা না থাকে।”
সুপারস্টারনিউজ/এআর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category