সুপারস্টারনিউজ ধর্ম ডেস্ক : মিরাস বা উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন ইসলামের এমন একটি বিধান, যা মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ।
তবে যদি তারা দুইয়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তাদের জন্য হবে, যা সে রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ; আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন তার জন্য অর্ধেক… তোমাদের মাতা, পিতা ও তোমাদের সন্তানসন্ততিদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে অধিক নিকটবর্তী তা তোমরা জানো না। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১)
এই আয়াতের তাফসিরবিদরা লেখেন, ‘অতএব মানুষের জন্য কোরআনের বিধানকে উপেক্ষা করে নিজেদের জ্ঞানানুযায়ী মিরাস বণ্টন করার সুযোগ নেই, বরং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তা বণ্টন করতে হবে এবং কোরআনে যার যতটা অংশ নির্দিষ্ট করা হয়েছে তাকে তা প্রদান করতে হবে।’ (তাফসিরে আহসানুল বয়ান)
তা ছাড়া আল্লাহর দেওয়া বিধানকে উপেক্ষা করা সীমালঙ্ঘনের শামিল, যার পরিণাম ভয়াবহ। সুরা নিসারই এক আয়াত পরই এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। …আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে।
আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক আজাব।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩-১৪)
নাউজুবিল্লাহ! এই আয়াত আমাদের বার্তা দেয় যে মহান আল্লাহর দেওয়া বিধানকে লঙ্ঘন করা কতটা ভয়াবহ গুনাহ এবং এর পরিণামও কতটা ভয়ংকর।
অনেকে মৃত্যুর আগেই কোরআনের নির্ধারিত উত্তরাধিকারদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পদ বণ্টন করে ফেলেন, এটা যে ইসলামের বিধান লঙ্ঘনের শামিল, তা উল্লিখিত কোরআনের আয়াত দ্বারাই বোঝা যায়।
আমাদের মহানবী (সা.)-ও এ ব্যাপারে সাহাবি নোমান ইবনে বশীর (রা.)-এর পিতাকে [যিনি তার এক সন্তানকে সম্পদ দেওয়ার ব্যাপারে মহানবী (সা.)-কে সাক্ষী রাখতে চেয়েছিলেন] সতর্ক করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করো। (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭)
অনেকে দাবি করে, তারা উত্তরাধিকারকে বঞ্চিত করার জন্য নয়, বরং তার মৃত্যু-পরবর্তী ফিতনা থেকে তার স্ত্রী-সন্তানদের বাঁচানোর জন্য কিছু সম্পদ জীবদ্দশায় তাদের নামে করে দিতে চায় এবং অন্য উত্তরাধিকার যাতে বঞ্চিত না হয়, তাদের জন্যও নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ রেখে যায়, এটাও সীমালঙ্ঘন।
এর সরল উত্তর হলো, মহান আল্লাহর সবার নিয়ত সম্পর্কে অবগত। কারো যদি বাস্তবেই উত্তরাধিকার ঠকানো উদ্দেশ্য না হয়, বরং তাদের জন্য অংশ রেখে শরিয়ত সমর্থিত যৌক্তিক কারণে কিছু সম্পদ জীবদ্দশায় কাউকে হেবা করে তা ভোগদখল বুঝিয়ে দেয়, তাহলে তা নিন্দনীয় নয়। যেহেতু মানুষ জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তির পূর্ণ মালিক থাকে, সে তা হেবা, বিক্রি সব করার অধিকার রাখে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হেবা করার উদ্দেশ্য ও পরিমাণ যদি হয়, অন্য উত্তরাধিকারদের পুরোপুরি বঞ্চিত করা, তাহলে তা অবশ্যই গুনাহের কাজ। যদিও হেবা কার্যকর হয়ে যাবে। (দারুল উলুম দেওবন্দ, ফতোয়া : ৯১৭-১০৭৪)
আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, হেবা আর উত্তরাধিকার সম্পদ এক নয়। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ যাদের উত্তরাধিকার সম্পত্তির অংশীদার নির্ধারণ করেছেন, তাদের ওপর কিছু দায়িত্বও অর্পণ করেছেন, দিনশেষে ব্যক্তির অবর্তমানে তার নিকটাত্মীয়রাই তার পরিবারকে দেখভাল করতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে। তাই তাদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
এসব আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়, উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে কাউকে বঞ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গোনাহ এবং সরাসরি আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন। অতএব প্রতিটি পরিবারের উচিত, উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং মানবিক লোভ, পারিবারিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপকে দ্বিনের ওপর স্থান না দেয়া।
সুপারস্টারনিউজ/এআর