সুপারস্টারনিউজ ধর্ম ডেস্ক : ইসলাম মানুষকে অন্যের কল্যাণ চিন্তা করতে বলে, অন্যের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করতে এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজের কল্যাণে বিদ্যালয়, মাদরাসা, হাসপাতাল, এতিমখানা, পাঠাগার, গবেষণাকেন্দ্রসহ অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা মহৎ কাজ।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিয়ে কখনো কখনো ব্যক্তিগত প্রচার, গোষ্ঠীস্বার্থ কিংবা আত্মপ্রশংসার প্রবণতা দেখা যায়, যা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান হবে মানুষের কল্যাণে
ইসলামে সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রথম নীতি ও শিক্ষা হলো এর উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পুণ্যের কাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো; পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’
(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
অতএব, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন—হাসপাতাল, বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে ব্যক্তি সমাজে কল্যাণের অবিরাম ধারা সৃষ্টি করতে পারে। পরকালে তার এসব কাজ সদকায়ে জারিয়া হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখায়, সে তা সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পায়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৮৯৩)
ব্যক্তি নামে প্রতিষ্ঠান করার বিধান
কোনো ব্যক্তি নিজের অর্থে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সেটি নিজের নামে বা তার পছন্দের কারো নামে পরিচিত করলে তাকে সরাসরি হারাম বলা যায় না।
ফিকহে মসজিদ ও ওয়াকফি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারির একটি অধ্যায়ের শিরোনাম করেছেন ‘অমুক বংশের মসজিদ বলা যাবে কি?’
এটা থেকে বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করা বা হওয়া নিষিদ্ধ নয়, যদি না কোনো মন্দ উদ্দেশ্য থাকে। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ‘পরিচয়ের উদ্দেশ্যে অমুকের মসজিদ বা অমুক বংশের মসজিদ বলা নিষিদ্ধ নয়।’ (আল মাজমু শরহুল মুহাজ্জাব : ২/২০৮)
অতএব, কোনো দাতা নিজের অর্থে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে সেটা তার নামে পরিচিত করা বৈধ হওয়ার অবকাশ রয়েছে, বিশেষত যদি উদ্দেশ্য হয় পরিচয়, ইতিহাস সংরক্ষণ বা দাতার অবদান স্মরণ করা।
আত্মপ্রচারের জন্য নামকরণ নয়
দাতা বা অন্য ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্দেশ্য আত্মপ্রচার করা হলে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কাজের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে লোক-দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার লোক-দেখানো প্রকাশ করে দেবেন; আর যে সুনাম প্রচারের জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার সুনাম প্রচারের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৮৭)
নামফলক নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়
ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য নামফলক স্থাপন করা একটি প্রাচীন রীতি। ইসলাম এই রীতির বিরোধী নয়; কিন্তু নামফলক স্থাপনের উদ্দেশ্য যদি হয় আত্মপ্রচার, গোষ্ঠীর প্রচার ও মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা, তবে তা ইসলামে নিষিদ্ধ; বিশেষত যখন নামফলকে দাতার নাম বিশাল অক্ষরে, পদ-পদবি ও প্রশংসার দীর্ঘ তালিকা পেশ করা হয়। কেননা এটা ইসলামের বিনয় ও ইখলাসের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্রতা (ও প্রশংসা) নিজেরা ঘোষণা কোরো না; কে তাকওয়াবান, সে সম্পর্কে তিনিই অধিক অবগত।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩২)
সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণে চাই সতর্কতা
সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কোনো দল বা গোষ্ঠীরও সম্পদ নয়। এগুলো জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করে গড়ে তোলা হয় এবং তা পরিচালনা করা হয়। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের নামকরণ এমনভাবে হওয়া উচিত যাতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ব্যক্তির নামে করতে হলে এমন ব্যক্তির নামেই হওয়া উচিত, যিনি জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু তা না করে যদি তাতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করা হয়, তবে তা আমানতের খিয়ানত হবে। আর আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার কোরো।’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
নামকরণ ও ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম ব্যক্তির অবদান অস্বীকার করে না। কোনো আলেম, সমাজসংস্কারক, শিক্ষক, দাতা বা জনহিতৈষীর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য তার নামে প্রতিষ্ঠান করা বৈধ হতে পারে। মিসরের দারুল ইফতাও ব্যক্তির নামে মসজিদ নামকরণকে মূলত বৈধ বলেছে। শর্ত হলো, উদ্দেশ্য ভালো হবে এবং রিয়া ও অহংকার থাকবে না। তবে নামকরণে কয়েকটি নীতি মনে রাখা জরুরি। তা হলো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেন ব্যক্তির বলে প্রতীয়মান না হয়, নাম যেন আত্মপ্রচারের মাধ্যম না হয়, জনস্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং কোনো বিতর্কিত বা অন্যায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে অযথা মহিমান্বিত করা না হয়।
জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো সাধারণ মানুষ ও সেবাগ্রহীতারা প্রতিষ্ঠাতাকে স্মরণ করবে এবং তার জন্য দোয়া করবে। তাকে অন্যের সামনে অনুপ্রেরণা হিসেবে পেশ করবে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাতা সবকিছুর ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেবে। অধিক সংখ্যক মানুষ যেন উপকৃত হতে পারে সে চেষ্টা করবে। বিশুদ্ধ নিয়ত ও ইখলাস জনসেবামূলক কাজকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে। মনে রাখতে হবে, মুমিনের জীবনে আল্লাহ সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭২)
আল্লাহ সবাইকে নিষ্ঠার সঙ্গে ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।
সুপারস্টারনিউজ/এআর