সুপারস্টারনিউজ ধর্ম ডেস্ক : মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সময়ের হিসাব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেকেন্ড, মিনিট ও ঘণ্টার ধারাবাহিকতায় আমরা সময় গণনা করি; আর সাত দিন মিলে গঠিত হয় এক সপ্তাহ।
সপ্তাহের প্রতিটি দিনের রয়েছে স্বতন্ত্র নাম ও পরিচিতি। ছোটবেলা থেকেই মানুষ পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক জীবনের মাধ্যমে এই দিনগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে সপ্তাহের দিনগুলো সম্পর্কে ইসলামী সূত্রে কী কী বর্ণনা এসেছে, তা জানা অনেকের কাছেই আগ্রহের বিষয়।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কোথাও এসেছে জুমার নামাজের নির্দেশ, কোথাও অতীতের কোনো জাতির ঘটনা, আবার কোথাও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের বিবরণ। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো দিনের নাম কোরআন-হাদিসে উল্লেখিত হওয়া এবং ওই দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ ফজিলত বা বিধান প্রমাণিত হওয়া এক কথা নয়। নিম্নে কোরআন ও হাদিসের আলোকে সপ্তাহের সাত দিনের উল্লেখযোগ্য বর্ণনা তুলে ধরা হলো।
১. শুক্রবার : মুসলিমদের সাপ্তাহিক সমাবেশের দিন
আরবি ‘জুমুআ’ শব্দের অর্থ একত্র হওয়া বা সমবেত হওয়া।
এ দিনে মুসলমানরা জুমার নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে সমবেত হন। ইসলামে শুক্রবার বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের নামেই পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নামকরণ করা হয়েছে—সুরা জুমুআ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সুরা : জুমুআ, আয়াত : ৯)
২. শনিবার : সাবত ও অতীতের একটি জাতির ঘটনা
আরবিতে শনিবারকে বলা হয় ইয়াওমুস সাবত।
পবিত্র কোরআনে ‘সাবত’ বা শনিবারের বিধান লঙ্ঘনকারী একটি সম্প্রদায়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিল, তাদের সম্পর্কে তোমরা অবশ্যই জানো। আমি তাদের বলেছিলাম, ‘তোমরা লাঞ্ছিত বানর হয়ে যাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৬৫)
৩. রোববার : ইয়াওমুল আহাদ
আরবিতে রোববারকে বলা হয় ইয়াওমুল আহাদ। রোববার সম্পর্কে আলোচ্য বর্ণনাগুলোর মধ্যে শিঙ্গা লাগানো বা হিজামার সময়সংক্রান্ত একটি বর্ণনা রয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নাফে (রহ.)-কে শিঙ্গা লাগানোর জন্য উপযুক্ত ব্যক্তির সন্ধান করতে বলেন এবং কয়েকটি দিনের কথা উল্লেখ করেন। ওই বর্ণনায় বুধবার, শুক্রবার, শনিবার ও রবিবারে হিজামা থেকে বিরত থাকার কথা এসেছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৮৭)
তবে এ বর্ণনার ভিত্তিতে রোববারকে অশুভ দিন মনে করা কিংবা এ দিনে কোনো কাজ করা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়।
৪. সোমবার : নবীজি (সা.)-এর জন্ম ও ওহি নাজিলের দিন
আরবিতে সোমবারকে বলা হয় ইয়াওমুল ইসনাইন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে সোমবারের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এ দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং এই দিনেই তাঁর প্রতি ওহি নাজিল হয়েছিল। আবু কাতাদা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিনেই আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনেই আমাকে নবুয়ত দেওয়া হয়েছে অথবা আমার প্রতি ওহি নাজিল করা হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
৫. মঙ্গলবার : নবীজির নবুয়তপ্রাপ্তি ও আলী (রা.)-এর নামাজ আদায়
আরবিতে মঙ্গলবারকে বলা হয় ইয়াওমুস সুলাসা। এ দিনের উল্লেখ পাওয়া যায় জামে তিরমিজির একটি বর্ণনায়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সোমবার নবুয়তপ্রাপ্ত হন এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) মঙ্গলবার নামাজ আদায় করেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৭২৮)
৬. বুধবার : হিজামা-সংক্রান্ত বর্ণনা ও তার গ্রহণযোগ্যতা
আরবিতে বুধবারকে বলা হয় ইয়াওমুল আরবি‘আ। হিজামা বা শিঙ্গা লাগানোর উপযুক্ত দিন নিয়ে বর্ণিত একটি হাদিসে বুধবারের কথা এসেছে।
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নাফে (রহ.)-কে হিজামা করার বিষয়ে নির্দেশনা দিতে গিয়ে বৃহস্পতিবার হিজামা করার কথা বলেন এবং বুধবারসহ কয়েক দিনে তা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ করেন। একই বর্ণনায় আইয়ুব (আ.)-এর পরীক্ষার প্রসঙ্গও এসেছে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৮৭–৩৪৮৮)
৭. বৃহস্পতিবার : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
আরবিতে বৃহস্পতিবারকে বলা হয় ইয়াওমুল খামিস। হাদিসে এ দিনের উল্লেখ রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছিলেন, ‘বৃহস্পতিবার! কী কঠিন ছিল সেই বৃহস্পতিবার!’ এরপর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময়ের ঘটনা বর্ণনা করেন। সে সময় নবীজি (সা.) বলেছিলেন, তাঁর জন্য লেখার উপকরণ নিয়ে আসতে, যাতে তিনি এমন কিছু লিখে দিতে পারেন, যার পরে মানুষ পথভ্রষ্ট হবে না। তখন উপস্থিত সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং লেখার উপকরণ আনার বিষয়টি সম্পন্ন হয়নি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪)
সপ্তাহের সাত দিনই আল্লাহর সৃষ্ট সময়ের অংশ। একজন মুমিনের কাছে প্রতিটি দিনই ইবাদত, সৎকর্ম, দায়িত্ব পালন এবং আত্মশুদ্ধির মহা সুযোগ। তাই দিন নিয়ে কুসংস্কারে না জড়িয়ে কোরআন-সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা অনুসরণ করাই একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য।
সুপারস্টারনিউজ/এআর