বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ন

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র : সতর্ক করল চীন-রাশিয়া

প্রতিনিধির নাম : / ১৫ Time View
প্রকাশকাল : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সুপারস্টারনিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছেন, এটি প্রতিপক্ষের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম। ওয়াশিংটনের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে চীন ও রাশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে স্থানীয় সময় সোমবার ‘এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার’ সম্মেলনে অস্ত্র মোতায়েনের কথা স্বীকার করেন মেইঙ্ক। এর আয়োজন করে দেশটির এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন। তাদের প্রকাশিত এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্স সাময়িকীর ওয়েবসাইটে মেইঙ্কের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

মহাকাশ নিয়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে অস্ত্র মোতায়েনের কথা জানালেন মেইঙ্ক। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওয়াশিংটনের অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি এতদিন ‘ওপেন-সিক্রেট’ ছিল। কিন্তু তারা এমন সময়ে ঘোষণাটি দিল, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনার মাত্রা বৃদ্ধি ও মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মেরিল্যান্ডের সম্মেলনে মার্কিন স্পেস অপারেশন্সের প্রধান জেনারেল ডগলাস শিয়েসও বক্তব্য দেন। তিনি জানান, স্পেস ফোর্স না থাকলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করা সম্ভব হতো না। শিয়েসের এই দাবির প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্স সাময়িকী।

গত মার্চ মাসের শুরুতে এক ব্রিফিয়ে ড্যান কেইন বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হয়। এতে সহায়তা করেছিল মহাকাশ ব্যবস্থা।

ট্রয় মেইঙ্ক যা বলেছেন
রুশ গণমাধ্যম আরটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্মেলনের মূল বক্তব্যে মেইঙ্ক বলেন, ‘হুমকির ধরন পরিবর্তন হয়ে যেখানেই দেখা দিক না কেন, তা মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে চলেছি। এ কারণেই কক্ষপথে মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র আছে। প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ।’

বক্তব্যে মেইঙ্ক বিস্তারিত আর কিছু জানাননি। প্রশ্নোত্তর পর্বে একই বিষয়ে জানাতে চাওয়া হলে তিনি শুধু বলেন, ‘বক্তব্যের ভাষা খুব ভেবেচিন্তে নির্ধারণ করা হয়েছে।’ এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, মেইঙ্ক সম্ভবত মার্কিন সেনা বা মার্কিন স্যাটেলাইটকে (কৃত্রিম উপগ্রহ) লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাওয়া শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইটকে ধ্বংস করার প্রযুক্তির কথা বলেছেন।

এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্স সাময়িকী লিখেছে, চীন ও রাশিয়া মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র তৈরি ও প্রদর্শন করছে। তাদের সেই আগ্রাসী তৎপরতার মধ্যে মেইঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মোতায়েন নিয়ে সরাসরি তথ্য দিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু পরীক্ষা করেছি নাকি করিনি- তা নিয়ে বিস্তারিত জানাতে চাইছি না। শুধু বলব, সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য মহাকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র যাতে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।’

আরটি লিখেছে, গণবিধ্বংসী নয় এমন অস্ত্র মহাকাশে মোতায়েনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে (২০১৯) মার্কিন স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তিনি মহাকাশকে ‘বিশ্বের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে গত বছর ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এটি পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি কয়েক স্তরের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর মধ্যে মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টরও আছে।

রুশ গণমাধ্যমটি আরও লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার কৌশলগত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ (এসডিআই) বা ‘স্টার ওয়ার্সের’ কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮৩ সালে এটি চালু করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। এতে মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তাব থাকলেও পরে প্রকল্পটি বাতিল হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া ২০০০-এর দশক থেকে স্যাটেলাইট বিধ্বংসী অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০২১ সালের নভেম্বরে রুশ সামরিক বাহিনী সোভিয়েত আমলের একটি অব্যবহৃত গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক আইন মেনে এ কাজ করা হয়েছে। এটি নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান নয়।

চীন-রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া
ট্রয় মেইঙ্কের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশ সামরিকীকরণ, অস্ত্র মোতায়েনের প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে চীন। মঙ্গলবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া বন্ধ করে।’

রাশিয়াও মহাকাশকে যেকোনো ধরনের অস্ত্র থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘মহাকাশকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে আমরা আন্তর্জাতিক ঐকমত্য আশা করছি।’

এএফপি লিখেছে, এই দুই ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিকে মহাকাশেও সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ওয়াশিংটন। মার্কিন স্পেস ফোর্সের মতে, সামরিক আধুনিকায়ন কৌশলের অংশ হিসেবে চীন মহাকাশ ও ‘কাউন্টার-স্পেস’ সক্ষমতা পরিচালনা করছে। অন্যদিকে রাশিয়াও মহাকাশকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখে। তারা মনে করে, ভবিষ্যতের সংঘাতে মহাকাশের আধিপত্য একটি ফ্যাক্টরে পরিণত হবে।

মহাকাশের সামরিকীকরণ মহাকাশ প্রতিযোগিতার মতোই পুরোনো। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম অনুসন্ধান যান হিসেবে কক্ষপথে স্পুটনিক পাঠিয়েছিল। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও মস্কো স্যাটেলাইটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার ও ধ্বংস করার উপায় খুঁজতে শুরু করে। ২০১৯ সালের মার্চে ভারত জানায়, তারা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি উচ্চতায় থাকা একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছে। এর মাধ্যমে তারা উন্নত মহাকাশ শক্তিগুলোর একটি হিসেবে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
সুপারস্টারনিউজ/এআর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category