বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন

ভিয়েতনাম জাতের কালো ধান চাষে সফল এক যুবক

প্রতিনিধির নাম : / ৩ Time View
প্রকাশকাল : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সুপারস্টারনিউজ প্রতিবেদক : জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার উদ্যোক্তা যুবক মো. রকিবুল হক (২৮) ভিয়েতনাম জাতের কালো ধান চাষে সফলতা অর্জন করেছেন।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দিনাজপুর বোচাগঞ্জে উপজেলার দিঘনবাড়ী গ্রামের যুবক মো. রকিবুল হকের ভিয়েতনাম জাতের কালো ধান ক্ষেত দেখে তার এই সফল উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

রকিবুল জানায়, ইউটিউব দেখে তার এই কালো ধান চাষে আগ্রহ এবং উৎসাহ বেড়ে যায়। এই জাতের ধান চাষের বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা নিতে রবিবুল ইউটিউবের মাধ্যমে ঢাকা খামারবাড়ী এবং বিভিন্ন কৃষি দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেন। এছাড়া গাজীপুর ও রাজশাহী জেলার দু’টি কৃষি ফার্মের দু’জন আধুনিক কৃষিবিদ তাকে কালো ধান চাষের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য ও চাষাবাদ পদ্ধতির কৌশল শিখিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি গত জুন মাসের মাঝামাঝি নাগাদ গাজীপুর শহরে একটি বীজ ভান্ডার থেকে ৫ কেজি ভিয়েতনাম জাতের কালো ধান বীজ ৪ হাজার ৫শ’ টাকায় কিনে নেন।

ওই বীজ সে ইউটিউবে পাওয়া চাষ পদ্ধতি অনুসরণে বীজতলা প্রস্তুত এবং কালো ধানের বীজ রোপণ করেন। বীজ রোপণের পর থেকে রকিবুল সঠিকভাবে বীজতলার পরিচর্যায় ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যে ধান বীজ রোপণ করতে সক্ষম হন। তার প্রস্তুত করা ধান বীজ গত জুলাই মাসে প্রথম সপ্তাহে লীজ নেয়া ৩৩ শতক জমিতে সফলভাবে দু’জন শ্রমিকের সহযোগিতায় রোপণ সম্পন্ন করেন।

রকিবুল বলেন, ইউটিউবে ‘ব্ল্যাক রাইসের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখে এর বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে জেনেছি। সেখানে ডায়াবেটিস, স্নায়ুরোগ ও বার্ধক্য প্রতিরোধে কালো চালের উপকারিতার কথা বলা হয়েছে। এতে ভিটামিন, ফাইবার ও মিনারেল রয়েছে বলেও জেনেছি। এসব কারণে এই ধান চাষে আগ্রহী হয়েছি।’ তিনি বলেন, এই কালো ধান চাষ করতে বাবার নিকট জমি চেয়েছিলাম। কিন্তু তার বাবা কালো ধান চাষের বিষয়ে পূর্বের কোনো ধারণা না থাকায় তার ওপর ভরসা পাননি। তাই তাকে কালো ধান চাষের জন্য তিনি কোনো জমি দেননি। কিন্তু তাতে হতাশ হননি রকিবুল। নিজের বাবার জমি না পেয়ে অন্যের ৩৩ শতক জমি ১৬ হাজার টাকা দিয়ে এক বছরের জন্য লীজ নিয়েছেন। সেই জমিতেই এখন দুলছে ভিয়েতনাম জাতের কালো ধানের শীষ। ধান কাটার আগেই এই জাতের ধান ক্ষেত দেখতে ভীড় করছেন এলাকার মানুষজন। তার ক্ষেতে কালো ধান বীজের জন্য আগাম যোগাযোগ করছেন অনেক কৃষক।

তিনি বলেন, প্রথমবার এই ধান চাষে ২০ থেকে ২২ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন। আশানুরূপ ফলন ও ভালো বাজারদর পেলে প্রায় ৩ লাখ টাকার কালো ধান বিক্রি করতে পারবেন। নিজের বাবার জমিতে তার শখের কালো ধান চাষ করতে চেয়েছিলেন রকিবুল। কিন্তু ছেলের নতুন উদ্যোগে শুরুতে ভরসা পাননি বাবা আমিনুল হক। তাই জমি দিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে জমি ইজারা নিয়ে কালো ধান চাষ শুরু করেন রকিবুল।

রকিবুল হক বলেন, কালো ধান সাধারণত অন্য সব ধানের মতোই চাষ হয়ে থাকে। এই ধান চাষে অতিরিক্ত সার বা পানির প্রয়োজন হয় না। আলাদা কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। প্রথমবার চাষ করে উৎপাদন কেমন হয়, পরিবারের জন্য কেমন হবে এবং এর ক্রেতা পাওয়া যাবে কি না? এসব জানতেই এই ধান চাষ শুরু করেছি। ফসল ভালো হলে আগামীতে ব্যাপকভাবে এই জাতের ধান চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

রকিবুল বলেন, তার জমির কালো ধানের শীষ সাধারণ ধানের তুলনায় বেশ কিছুটা বড়। ধান যেমন কালো, চালও তেমন কালো। এই চালের ভাত কালো রঙের হয়। পরিবারের জন্য খাওয়া এবং উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি বাজারে এর চাহিদা কেমন হবে তা বুঝতে তার এই পরীক্ষামূলক চাষের উদ্দেশ্য বলে সে জানায়।

রকিবুলের বাবা আমিনুল হক বলেন, প্রথমে এ ধরনের ধান চাষে কোন ভরসা পাইনি। মনে করছিলাম, ছেলে ইন্টারনেট দেখে খামখেয়ালি করছে। তাই আমি তাকে এ ধরনের ধান চাষ করতে জমি দিইনি। কিন্তু জমি ইজারা নিয়ে কালো ধান চাষ করেছে তার ছেলে। এখন দেখে মনে হচ্ছে, ছেলেটি আমার ভালো উদ্যোগ নিয়ে এ ধরনের ধান চাষে এলাকায় ব্যপক সাড়া ফেলেছে। আগামীতে তার যত জমি প্রয়োজন হয় আমি তাকে ধান চাষের জন্য দিয়ে দিব। সে যত বেশি চাষ করবে, তাকে সব দিক দিয়ে সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানান।

জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নয়ন কুমার সাহা বলেন, ‘ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্থোসায়ানিন, ফাইবার ও আয়রন-সমৃদ্ধ একটি মান সম্পন্ন কালো ধান। পুষ্টি গুণের আধিক্যের কারণে বিশ্বজুড়ে সর্বমহলে কালো রাইসকে ‘সুপারফুড’ বলা হয়। রোগ প্রতিরোধে এই ধানের চাল উৎপাদন করে যদি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। দেশের কৃষি বিভাগের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন।’

জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘ব্ল্যাক রাইস’ চাষ হচ্ছে। বোচাগঞ্জ উপজেলায় এবারে প্রথম এই ধানের চাষ হয়েছে। সঠিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারলে এটি লাভজনক ফসল হতে পারে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, আমি গত কয়েক দিন পূর্বে রকিবুল হকের ভিয়েতনাম জাতের কালো ধান ক্ষেত সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে চাইনিজ রেস্তোরাঁগুলোতে এই চালের কদর অনেক বেশি। আমরা কৃষি বিভাগ রকিবুল হকের সফলতা দেখার অপেক্ষায় রয়েছি। যেনো তাকে অনুসরণ করে আরও অনেক তরুণ ও যুবকের এ ধরনের অধিক মূল্যের চাহিদাসম্পন্ন কালো ধান চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
সুপারস্টারনিউজ/এআর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category