প্রধান নিউজ
দেশে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে, দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী যে সাহাবির তিলাওয়াত শুনে অশ্রুসিক্ত হয়ে যেতেন মহানবী (সা.) ক্যাস্টর অয়েলের ৫ বিস্ময়কর ব্যবহার প্রযুক্তিনির্ভর সিনেমায় সিনথিয়া তাহসিফ হত্যা মামলা: তৃতীয় দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে দীপ বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২০০০ কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর সাইবারট্রাক উৎপাদন বন্ধের ইঙ্গিত ইলন মাস্কের যুদ্ধের শুরুর তুলনায় ইরানের সামরিক বাহিনী এখন ‘আরও শক্তিশালী’: সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ধামরাইয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা সেই প্রবীণ দম্পতির পাশে প্রশাসন ওপার থেকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে দেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে ফ্যাসিবাদীরা: সপু
রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন

পাকিস্তানে নারী ও ন্যায়বিচারের মাঝে বাধা যখন লিঙ্গবৈষম্য

প্রতিনিধির নাম : / ৩১ Time View
প্রকাশকাল : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

সুপারস্টারনিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পারিবারিক সহিংসতার বিচার চাইতে আদালতের বারান্দায় পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন পাকিস্তানি নারীর আইনি লড়াইয়ের সামনে বাধা আসে। আর সেই বাধার সূচনা হয় সাধারণত কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার অনীহা বা অভিযোগ নিয়ে সন্দেহের মধ্য দিয়ে; কিংবা ঘরের ভেতরের সহিংসতাকে শুধুই ‘পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার মানসিকতার মাধ্যমে।

দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা এই স্পর্শকাতর ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতাকে সম্প্রতি সরাসরি দেশটির বিচার ব্যবস্থার সামনে নিয়ে এসেছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। গত ১৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক ঐতিহাসিক রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—নারীদের প্রতি সহিংসতা রোধে শুধু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই চলবে না, বরং পুলিশের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকেও লিঙ্গ-সংবেদনশীল দৃষ্টিতে পরিচালনা করতে হবে।

বিচারপতি মুহাম্মদ হাশিম খান কাকারের নেতৃত্বাধীন দুই বিচারপতির বেঞ্চ রায়ে বলেন, ‘নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা মোকাবেলা করার সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের ভেতর লুকিয়ে থাকা পিতৃতান্ত্রিক ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক সংস্কার কাটিয়ে ওঠার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।’

হত্যাকাণ্ডের এক পারিবারিক মামলার সূত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ আসলেও, এর প্রভাব একটি নির্দিষ্ট মামলার চেয়ে অনেক বেশি।

রায়টি এমন এক পুরনো সংস্কৃতিকে সরাসরি আঘাত করেছে, যেখানে ঘরের ভেতরে ঘটে যাওয়া সহিংসতাকে লোকলজ্জা বা সামাজিক গোপনীয়তার অজুহাতে বিচার ব্যবস্থার বাইরে রাখা হতো।

সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে আসল ট্র্যাজেডি শুধু এটুকুই নয় যে একজন নারীকে তার নিজের ঘরে হত্যা করা হয়েছে; বরং ট্র্যাজেডি হলো হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক তথ্য ও প্রমাণও সেই চার দেয়ালের ভেতরে গোপনে গোপন করা যায়। আদালত জোর দিয়ে বলেছেন, বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা যেন কোনো অপরাধীর পার পাওয়ার ‘ঢাল’ না হয়, তা নিশ্চিত করাই বিচার ব্যবস্থার আসল দায়িত্ব।

সাধারণ অপরাধের মতো পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে তেমন কোন নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায় না, পরিবারের সদস্যরা সাক্ষ্য দিতে ভয় পান এবং প্রমাণাদি দ্রুত ধ্বংস করে ফেলা হয়।

ফলে ভুক্তভোগীর অনুপস্থিতিতে একজন নিরপেক্ষ তদন্ত কর্মকর্তাকে শুধু সামাজিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের নিরপেক্ষ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে।

জাতিসংঘের ‘ইউএন উইমেন’-এর তথ্য মতে, পাকিস্তানের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে যে বিপুল পরিমাণ নারী নির্যাতনের শিকার হন, পাকিস্তানের চিত্র তার চেয়ে আলাদা নয়।

হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু তথাকথিত ‘অনার কিলিং’ বা সম্মান সংক্রান্ত সহিংসতায় অন্তত ৪৭০ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের ‘জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি’ নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি আশঙ্কাজনক হারে সহিংসতা বৃদ্ধি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তদন্তে পুলিশি অবহেলা ও বিলম্বের সমালোচনা করেছে।

তবে পাকিস্তানে আইনগত কাঠামোর কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু তা প্রয়োগের। ২০১২ সালের ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষামূলক) আইন’-এর পাশাপাশি পাঞ্জাব, সিন্ধ, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলোচিস্তানে নিজস্ব প্রাদেশিক আইন বিদ্যমান। এমনকি দেশে অন্তত ৪৮০টি বিশেষায়িত জেন্ডার-বেসড ভায়োলেন্স আদালত রয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালেই প্রায় ৪৮ হাজার নতুন মামলা দায়ের হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত আইন থাকা সত্ত্বেও তদন্তকারীদের ভেতরে চেপে থাকা পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই মূল প্রমাণ নষ্ট করে দেয়।

তদন্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশটির বিচার বিভাগেও পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব বেশ দৃশ্যমান। ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস কমিশন অব পাকিস্তান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির মোট ৩ হাজার ১৪২ জন বিচারক ও বিচারিক কর্মকর্তার মধ্যে নারী মাত্র ১৮ শতাংশ। আর সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টগুলোর উচ্চস্তরের ১২৬ জন বিচারকের মধ্যে মাত্র ৭ জন নারী, যা শতকরা হিসাবে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি আয়েশা মালিক ২০২৫ সালে এক বক্তব্যে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দেশে নারী আইনজীবীর সংখ্যা ২৫-২৬ শতাংশ হলেও বিচারক পদে তাদের উপস্থিতি মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি, যা পুরো আইনি পরিবেশকে চরমভাবে পুরুষকেন্দ্রিক করে রেখেছে।’

আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ভাষাও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সহিংসতার শিকার নারীর চরিত্র, পোশাক বা আচরণের দিকে আঙুল তুলে প্রায়ই অপরাধীর আসল অপরাধকে ছোট করে দেখার চেষ্টা করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে এই প্রবণতাকে কঠোরভাবে খণ্ডন করে জানিয়েছে, বৈবাহিক সম্পর্ক বা পারিবারিক সম্মানের দোহাই দিয়ে সহিংসতার তদন্তকে শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই।
সুপারস্টারনিউজ/এআর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category